| |
               

মূল পাতা ইসলাম গ্রেফতার আলেমদের মুক্তি দিতে হবে : হেফাজতে ইসলাম


গ্রেফতার আলেমদের মুক্তি দিতে হবে : হেফাজতে ইসলাম

শীর্ষ ৩ আলেমের স্মরণে হেফাজত ও খতমে নবুওয়তের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত


রহমতটোয়েন্টিফোর ডেস্ক     01 October, 2021     11:44 PM    


হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ও তাহাফফুজে খতমে নবুওয়ত বাংলাদেশের ৩ শীর্ষ মুরুব্বি শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমাদ শফী (রহ.), শায়খুল হাদীস আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী (রহ.) ও মুফতিয়ে আজম আব্দুস সালাম চাটগামী (রহ.) এর জীবন ও কর্ম শীর্ষক আলোচনা সভা ও দুআ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ অনুষ্ঠান থেকে দেশের শীর্ষ আলেমরা সরকারের প্রতি আবারও বন্দি আলেমদের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন।

শুক্রবার (১ অক্টোবর) বাদ জুমআ জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে এ স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়।

এতে সভাপতিত্ব করেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নায়েবে আমীর ও জামিয়া নূরিয়া কামরাঙ্গীরচর মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আতাউল্লাহ হাফেজ্জী।

অসুস্থতার জন্য স্মরণ সভায় উপস্থিত হতে পারেননি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর, তাহাফফুজে খতমে নবুওয়ত বাংলাদেশের প্রধান পৃষ্ঠপোষক আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী।

তবে তার পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করে শোনানো হয়।

লিখিত বক্তব্যে আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অসুস্থতার কারণে আমি সশরীরে উপস্থিত হয়ে আজকের স্মরণ সভায় বক্তব্য রাখতে পারিনি। এজন্য উপস্থিত আলোচক ও শ্রোতামণ্ডলীর নিকট দুঃখ প্রকাশ করছি।

তিনি বলেন, যাদের স্মরণে আজকের এই আয়োজন, তারা সকলেই ছিলেন আমার অত্যন্ত কাছের মানুষ। হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আমীর ও হাটহাজারী মাদরাসার মুহতামিম শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. ছিলেন আমাদের রাহবর। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের আলেম সমাজের অভিবাবক। তিনি নাস্তিকবাদী শক্তির বিরুদ্ধে শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি উম্মাহর কল্যাণে যে অবদান রেখে গেছেন, তা এই দেশের মানুষ আজীবন স্মরণ রাখবে। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের আলেম সমাজের মধ্যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে। আমরা তাঁর দারাজাত বুলন্দির জন্য মহান আল্লাহর কাছে দুয়া করি।

আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, হেফাজতে ইসলামের দ্বিতীয় আমীর ও বাংলাদেশের তৌহিদী জনতার আপসহীন রাহবার শাইখুল হাদীস আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী রহ. ছিলেন আমার আপন ভাগিনা। মহান রবের হুকুম, তিনি আমার আগেই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন।

হেফাজত আমীর বলেন, আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী একাধারে একজন প্রসিদ্ধ শাইখুল হাদীস, লেখক ও সংগঠক ছিলেন। তিনি যে মানের আলেম ছিলেন, তার সমপর্যায়ের কেউ বর্তমানে নেই। তিনি আমার মরহুম পিতা আল্লামা হারুন বাবুনগরী রহ., আল্লামা ইউসুফ বান্নুরী রহ., আল্লামা আবদুল ওয়াহাব রহ. ও তাঁর পিতা আল্লামা হাফেজ আবুল হাসান রহ. এর মতো বড় বড় আলেমের সোহবতে থেকে গভীর ইলমে দ্বীন হাসিল করেন। দীর্ঘ সময় তিনি বাবুনগর মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। এরপর আল্লামা আহমদ শফী সাহেব রহ. তাঁকে হাটহাজারীতে নিয়ে আসেন। তিনি হাটহাজারীতেও সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা করেন।

তিনি আরও বলেন, আল্লামা বাবুনগরী হেফাজতের আন্দোলনের শুরু থেকে মাঠে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এর জন্য তাঁকে জেল-জুলুম সহ্য করতে হয়েছে। এতকিছুর পরেও তাঁকে কেউ নীতি থেকে সরাতে পারেনি। নানা অপবাদ দেওয়া হয়েছে তাঁর নামে। মৃত্যুর আগে নানারকম চাপেও ছিলেন তিনি। মহান আল্লাহ তাঁকে নিয়ে গেছেন। আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরীর মৃত্যুতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কখনো পূর্ণ হওয়ার নয়।

হেফাফত আমীর বলেন, মুফতী আবদুস সালাম চাটগামী সাহেব রহ. ছিলেন ইসলামী আইনের বিশেষজ্ঞ। তাঁর মতো এতো বড় মাপের মুফতী এই উপমহাদেশে খুব কমই ছিল। তিনি হাজার হাজার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে লাখো ফতোয়া দিয়ে গেছেন। উম্মাহর কল্যাণে তিনি যে অবদান রেখেছেন, তা জাতি স্মরণ রাখতে বাধ্য। মুফতী আবদুস সালাম সাহেব ছিলেন পুরোপুরি প্রচার বিমুখ মানুষ। নিজেকে আড়ালে রেখে এলেম চর্চা-ই ছিল তাঁর লক্ষ্য। এমন প্রচার বিমুখ তাকওয়াবান আলেমে দ্বীন এই যুগে খুঁজে পাওয়া যায় না।

তিনি বলেন, আমরা মহান আল্লাহর দরবারে এই তিন বুজুর্গ আলেমসহ গত কয়েক বছরে ইন্তেকাল করা সকল আলেমে দ্বীন; বিশেষ করে হেফাজতের সাবেক মহাসচিব আল্লামা নুর হোসেন কাসেমী রহ., মুফতী ওয়াক্কাস রহ., মাওলানা আশরাফ আলী রহ., মাওলানা তাফাজ্জল হক হবিগঞ্জী রহ., মাওলানা আজহার আলী আনোয়ার শাহ রহ.সহ সকল আলেমে দ্বীনের জন্য দুয়া করি।

মহান আল্লাহ তায়ালা যেন তাদের যাবতীয় নেক আমল কবুল করেন এবং সকলের কবরকে জান্নাতের টুকরা বানিয়ে দেন। আমীন।

হেফাফত আমীর বলেন, আজকের এই আলোচনা সভা ও দুয়া মাহফিল থেকে সরকারের কাছে সকল বন্দি উলামায়ে কেরামকে মুক্তি দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি। যারা জেলের ভীতরে আছেন আল্লাহ তাদের ধৈর্য ধারণের তৌফীক দান করুক, এবং যারা বাহিরে আছেন, আল্লাহ তাদের হেফাজত করুন। আমীন।

সভাপতির বক্তব্যে আল্লামা আতাউল্লাহ হাফেজ্জী বলেন, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিতা আমীর শাইখুল ইসলাম আল্লামা আহমদ শফী রহ. এবং পরবর্তী আমীর শাইখুল হাদীস আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী রহ. এবং মুফতি আযম মুফতি আব্দুস সালাম চাটগামী রহ. ছিলেন আমাদের ওলামায়ে দেওবন্দ তথা আকাবের ও আসলাফদের উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। তাঁরা নিজেদের কর্ম ও জীবনে দেওবন্দী মসলক ও মানহাজ থেকে সামান্যতম পিছপা হননি। তাঁদের আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি হননি। এটাই তাঁদের সফলতার একমাত্র কারণ।

তিনি আরও বলেন, আজ বাংলাদেশে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে একের পর এক যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে, আমরা যদি তা প্রতিহত করার জন্য এখন থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ না করি তবে ভবিষ্যতে ঈমান ও আমল নিয়ে টিকে থাকা আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে যাবে। এজন্য আল্লাহর দরবারে আমাদের বেশী বেশী রোনাজারি করতে হবে।

প্রধান বক্তার বক্তব্যে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর মহাসচিব ও আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়ত বাংলাদেশ-এর সভাপতি আল্লামা নুরুল ইসলাম বলেন, শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. ছিলেন আমার প্রাণপ্রিয় উসতাদ ও শায়েখ ও মুরশিদ। তিনি সব ক্ষেত্রে আমার রাহবরী করেছেন। তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিলো বাবা ছেলের মতো। তিনি ছিলেন এই দেশের আলেম-উলামাদের ওপর বট গাছের ছায়ার মতো। এক বছরের বেশি সময় হয়েছে তিনি চলে গেছেন। আমরা প্রতি মুহূর্তে তাঁর শূন্যতা অনুভব করি।

আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী রহ. বয়সে আমার ছোট হলেও আমার আগেই আল্লাহ তাঁকে নিয়ে গেছেন। আমাদের সম্পর্ক ছিলো আপন ভাইয়ের মতো। আমরা ছোট থেকেই এক সঙ্গে বড় হয়েছি। আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী ইলমি দুনিয়ায় যেমন অদ্বিতীয় ছিলেন, তেমনি ইসলাম বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে ছিলেন আপোষহীন। শত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও তিনি ছিলেন নীতির বিষয়ে অনড়। তাঁর মধ্যে আমরা আল্লামা ইউসুফ বান্নুরী রহ.-এর ছায়া দেখতে পেতাম। তিনি এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন, তা আমরা ভাবতেও পারিনি।

মুফিয়ে আজম মুফতী আবদুস সালাম চাটগামী সাহেব ছিলেন আপদমস্তক একজন এলমি মানুষ। দুনিয়ার মোহোমায়া থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন আজীবন। প্রচারবিমুখ মানুষ হওয়ায় খুব কম মানুষই তাঁর বিষয়ে জানতে পারত। এমন একজন মুখলেস ও বিজ্ঞ আলেমে দ্বীনের চলে যাওয়ায় উম্মাহর জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেলো।

এছাড়াও গত কয়েক বছরে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন হেফাজতের সাবেক মহাসচিব আল্লামা নুর হোসেন কাসেমী রহ., মুফতী ওয়াক্কাস রহ., মাওলানা আশরাফ আলী রহ., মাওলানা তাফাজ্জল হক হবিগঞ্জী রহ., মাওলানা আজহার আলী আনোয়ার শাহ রহ.-সহ অনেকে। এই অল্প সময়ের ব্যবধানে আলেম-উলামাদের এভাবে একের পর এক চলে যাওয়া জাতির জন্য দুর্ভাগ্যের। আমরা মরহুম সকল আলেম-উলামাদের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে দুয়া করি। আল্লাহ যেন সকলকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করেন। আমীর।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ প্রতিষ্ঠিত সংগঠন। তিনি যে উদ্দেশ্যে হেফাজতকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, আমরা সে উদ্দেশ্য নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি। আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়তের দীর্ঘ সময় আমীরের দায়িত্ব পালন করেছেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী সাহেব রহ। খতীব মাওলানা উবায়দুল হক সাহেব রহ. এর ইন্তেকালের পর থেকে তিনিই নেতৃত্ব দিয়েছেন খতমে নবুওয়তের। মৃত্যু অবদি তিনি এই দায়িত্ব পালন করেছেন।

হেফাজত ও খতমে নবুওয়ত দুইটাই সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক সংগঠন। এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের কোনো রকম সম্পর্ক নেই। হেফাজত অরাজনৈতিক আধ্যাত্মিক সংগঠন। আর খতমে নবুওয়ত ঈমানী দাবি আদায়ের সংগঠন।

আমরা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে চাই, আমাদের কোন রাজনৈতিক এজেন্ডা নেই। আমাদের রাজনৈতিক উচ্চাবিলাসও নেই। আমরা কেবল দ্বীনি সংগঠন হিসেবে কাজ করে যেতে চাই। আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমরা আমাদের ঈমানী দাবি আদায়ের জন্য কাজ করে যাব ইনশা আল্লাহ।

সরকার আমাদের অনুরোধে অনেক আলেম-উলামাকে মুক্তি দিয়েছে। এজন্য আমরা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আমরা অনুরোধ করব, যারা এখনো জেলের মধ্যে আছে, তাদেরকে মুক্তি দেওয়া হোক। আমরা আশা করব সরকার আমাদের অনুরোধ রক্ষা করবে।

এছাড়াও আমাদের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি আহ্বান থাকবে, দেশের মধ্যে অরাজকতা তৈরির চেষ্টাকারী কাদিয়ানীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা হোক। তারা দেশের মধ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরির পাঁয়তারা করছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে তারা দেশের মধ্যে অরাজকতা তৈরি করতে পারে।

সভায় আরও বক্তব্য রাখেন, মাওলানা আবুল কালাম, মাওলানা আব্দুল আউয়াল, মুফতি মুবারকুল্লাহ, মাওলানা সাজিদূর রহমান, মাওলানা মাহফুজুল হক, বেফাক মহাসচিব মাওলানা শিব্বির আহমদ রশিদ, মাওলানা মুহিউদ্দিন রব্বানী, মুফতী হাবিবুর রহমান কাসেমী, মাওলানা আহমদ আলি কাসেমী, মাওলানা মাহমুদুল হাসান ফতেহপুরি, মাওলানা মুসা বিন ইজহার, মাওলানা মীর ইদ্রিস, মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরি, মাওলানা আব্দুল কাইউম সুবহানী, মাওলানা কেফায়াতুল্লাহ আজহারি, মাওলানা ফয়সাল প্রমুখ।

/জেআর/